মেঘনায়l সি-ট্রাকের অপেক্ষায় মনপুরা-তজুমদ্দিনের লাখো মানুষ

DipKantha
DipKantha
প্রকাশিত: ১২:২৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২৬

তিন মাস ধরে বন্ধ ‘এসটি ইলিশা’, ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলারে মেঘনা পাড়ি; দুর্ঘটনার শঙ্কা, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

জি এম ছানাউল্লাহ//

ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা ও তজুমদ্দিনের লাখো মানুষের নিরাপদ নৌযোগাযোগের অন্যতম ভরসা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) সি-ট্রাক ‘এসটি ইলিশা’ প্রায় তিন মাস ধরে বিকল হয়ে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন শত শত যাত্রী বাধ্য হয়ে উত্তাল মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছেন ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলার ও ছোট নৌযানে। বর্ষা মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া, প্রবল স্রোত ও আকস্মিক ঝড়ের মধ্যে এই যাত্রা যেন প্রতিদিনের মৃত্যুঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনেও বিকল্প সি-ট্রাক চালু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নৌযান ছিল বিআইডব্লিউটিসির সি-ট্রাক ‘এসটি ইলিশা’। প্রায় তিন মাস আগে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার পর থেকে নৌযানটির চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ইজারাদার পরিবর্তন হলেও সেবা পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে মনপুরা ও তজুমদ্দিনের হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছেন।
সরেজমিনে তজুমদ্দিনের মেঘনা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীবোঝাই একের পর এক ট্রলার মনপুরার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ট্রলারেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। অনেক যাত্রী লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছেন। বর্ষার উত্তাল মেঘনায় অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচলকারী এসব ট্রলার যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
যাত্রী আলাউদ্দিন মাষ্টার বলেন, সি-ট্রাক চালু থাকলে নিশ্চিন্তে যাতায়াত করা যেত। এখন ট্রলারে উঠলেই ভয় কাজ করে। মাঝনদীতে ঝড় উঠলে আল্লাহর নাম ছাড়া আর কিছু মনে থাকে না।
আরেক যাত্রী মো. নোমান বলেন, মনপুরা যেতে হলে এখন জীবন হাতে নিয়েই নদী পার হতে হয়। নিরাপদ যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা নেই।
মনপুরার বাসিন্দা ও ভোলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. মহিউদ্দিন বলেন, এ রুটে মেঘনার স্রোত অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। ট্রলারে চলাচল সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। তিন মাস ধরে সি-ট্রাক বন্ধ, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সি-ট্রাক চালু থাকাকালে যেখানে প্রায় দুই ঘণ্টায় মনপুরা-তজুমদ্দিন যাতায়াত করা যেত, বর্তমানে ট্রলারে সময় লাগছে তিন থেকে চার ঘণ্টা। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে ভাড়া ও দুর্ভোগ। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, জেলে ও কৃষিপণ্য পরিবহনকারীরা। জরুরি রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
এদিকে সি-ট্রাক বন্ধ থাকার সুযোগে একটি চক্র অবৈধভাবে ট্রলার চালিয়ে যাত্রী পরিবহন করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনেক ট্রলারে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হলেও তদারকির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সচেতন নাগরিকরা অবৈধ ট্রলারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা এবং লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ ভোলা নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। সেখানে অবৈধ ট্রলার চলাচলের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান জানান, “ইঞ্জিন বিকল এবং ইজারা পরিবর্তনজনিত জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে খুব শিগগিরই বিকল্প একটি সি-ট্রাক এই রুটে সংযুক্ত করা হবে।
বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে মেঘনা নদীতে স্রোত ও ঢেউ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ছোট ট্রলারে যাতায়াত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ মনপুরা ও তজুমদ্দিন উপজেলার হাজারো মানুষ প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। নিরাপদ সরকারি নৌযান বন্ধ থাকায় তাদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয় দ্রুত বিকল্প সি-ট্রাক চালু করে নিরাপদ নৌযোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং যাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দেওয়া মনপুরা ও তজুমদ্দিনের মানুষের এখন একটাই আকুতি আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, অবিলম্বে বিকল্প সি-ট্রাক চালু করে নিরাপদ নৌযাতায়াত নিশ্চিত করুক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।