গণতন্ত্রের পথচলায় নীরব যোদ্ধাদের প্রাপ্য স্বীকৃত

লেখা-জি এম ছানাউল্লাহ গণমাধ্যম কর্মী।
গণতন্ত্রের ইতিহাস কখনো কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নয়; এটি ত্যাগ, সাহস, নৈতিক অবস্থান এবং দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাস। যে কোনো গণতান্ত্রিক অর্জনের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি নীরবে কাজ করেন শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী এবং নাগরিক সমাজের অসংখ্য মানুষ। তাঁদের সম্মিলিত ভূমিকা ছাড়া গণতন্ত্রের ভিত কখনোই সুদৃঢ় হয় না।
গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বহু মানুষ ব্যক্তিগত ও পেশাগত ঝুঁকি নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। অনেকে হামলা, মামলা, হয়রানি, চাকরি হারানোর আশঙ্কা এবং সামাজিক চাপ উপেক্ষা করে নিজেদের অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক জুলাইয়ের আন্দোলনেও বহু শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও তরুণ নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের এই ভূমিকা নিঃসন্দেহে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি নতুন অধ্যায়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে যাঁরা সংকটের সময় গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন কি নিশ্চিত হচ্ছে? রাজনৈতিক কর্মীদের অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি হিসেবে শিক্ষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অবদানও সমানভাবে মূল্যবান। কারণ একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে এমন উদ্বেগ প্রকাশিত হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা অবশ্যই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া উচিত। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিয়োগ, পুনর্বাসন কিংবা দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনআস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের নীতি।
সরকারের প্রতি প্রত্যাশা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের অবদানকে মর্যাদার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রেখে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা হবে। কারণ ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির ভিত্তি।
গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য বিজয়ে নয়, বরং বিজয়ের পর ন্যায়, স্বচ্ছতা ও কৃতজ্ঞতার চর্চায়। যে রাষ্ট্র তার সংকটের সময় পাশে দাঁড়ানো মানুষদের সম্মান দিতে পারে, সেই রাষ্ট্রই ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নির্মাণে সক্ষম হয়। তাই আজ সময়ের দাবি গণতন্ত্রের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা নীরব যোদ্ধাদের যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট রাখার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
